প্রথম পর্বের পর…
গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রে জনপ্রতিনিধিদের পরিচয় জনগণের কাছে সর্বদা স্পষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়। তাই সংসদের মতো রাষ্ট্রীয় ও নীতি-নির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে কোনো সদস্যেরই মুখ ঢেকে উপস্থিত হওয়া উচিত নয়।
পরিচয় ও নিরাপত্তা যেখানে প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে প্রগতির স্বার্থেই আমাদের এই নারীবিদ্বেষী ধর্মীয় সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকেই ইসলামপন্থীদের উত্থান ঘটেছে। শরিয়াহ আইনের আওয়াজ তোলা হচ্ছে, যা আগের চেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশে প্রকাশ্যে দেখা গেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের নেতাকর্মীদের। যারা কলেমাখচিত কালো পতাকার ঝান্ডা নিয়ে দেশটাকে আবারও আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াত বানাতে চায়। যেখানে কন্যাসন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। নবী মোহাম্মদের মতো ভণ্ড ধর্ম প্রচারকেরা নিজেদের নবী দাবি করত। নবী মোহাম্মদ এমন একজন জাহেলিয়াত ছিলেন, শিশু আয়েশা, যার বয়স মাত্র ৬ বছর; ঋতুচক্রও যার শুরু হয়নি, এমন শিশুকেও বিয়ের নামে ধর্ষণ করেছে দিনের পর দিন। এই যৌন নবীর উম্মতেরা জামায়াতে ইসলামীর মতো খচ্চর, ১৯৭১ সালে নারী ধর্ষণকারীরা জাতীয় সংসদে। যাদের নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই, যারা বিশ্বাস করে না নারীর স্বাধীনতায়।
এরা নারীদের দ্বীনি ইসলামের হিজাব ও নেকাব পরিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিগত সহাবস্থানে লিপ্ত হতে বাধ্য করে। এরাই দেশে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের আওয়াজ তুলছে, জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থার মদদ জোগাচ্ছে।
কিন্তু বিএনপি? যারা রাষ্ট্রক্ষমতার চেয়ারে?
একজন সংসদ সদস্য নারীদের পক্ষে আওয়াজ তুলতেই সংসদের স্পিকার পর্যন্ত নারীদের অধিকারের পক্ষে না দাঁড়িয়ে উক্ত সংসদ সদস্যের বক্তব্যকে উপেক্ষা করলেন। বললেন, অবমাননাকর। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এমন বিষয়ে টু শব্দটি করেনি।
প্রশ্ন আছে তারেক রহমানের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বেশ পুরনো। ২০০১-২০০৬ সারাদেশে তাঁর রাজনৈতিক কার্যালয় হাওয়া ভবনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। সে সময় বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য ও তদন্ত প্রতিবেদনে তারেক রহমানকে জঙ্গিবাদের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশদাতা হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার পূর্বাপর বিভিন্ন সময়ে হাওয়া ভবনে তারেক রহমানের সাথে হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, মাওলানা তাজউদ্দিন (হুজি-বি সংশ্লিষ্ট নেতা), মাওলানা শেখ ফরিদ এবং জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদও অংশ নেয়।
এটি স্পষ্ট বর্তমানে সংসদে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই বাংলাদেশে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থার চাষাবাদের সাথে সরাসরি যুক্ত। সেখানে এমন বিতর্কিত দুটি রাজনৈতিক দল ও তারেক রহমানের পর রাজনীতির কালো সন্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন দেশের স্বাধীনতা, ভবিষ্যত বাংলাদেশে নারীদের অধিকার , ভিন্ন ধর্ম ও যৌন পরিচয়ের মানুষদের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
কিন্তু সংসদে উপস্থিত সেসব নারীরা ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা আর মৌলবাদীদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তখনও সাহস করে দাঁড়াতে পারেনি। নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নটি এখনও বহু দেশে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, হেজবুত তাওহীদসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলগুলো কেন দেশে শরিয়াহ আইনের বাস্তবায়ন চায়?
কোরানের আইন চায়?
এরা সেই জাহেলিয়াতকেই ফিরিয়ে আনতে চায়। আফগানিস্তানের মতো নারীবিদ্বেষী ও দমনমূলক পরিবেশ তৈরি করতে চায়। রাষ্ট্রটাকে একটি পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।
কিন্তু কোন নারী কি নিপীড়ন, বৈষম্য ও অবমাননার জীবন মেনে নিতে রাজি? না, রাজি নয়। তারা শিক্ষা চায়, কাজ চায়, স্বাধীনতা চায়। তারা মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার চায়। নারীরা আফগানিস্তান ও ইরানের নারীদের ভাগ্যবরণ করতে চায় না। কিন্তু এসব মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী দেশকে ইরান ও আফগানিস্তান বানাতে চায়। বাংলাদেশকে একটি তালেবানি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে, বহু কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিষিদ্ধ করেছে এবং জনজীবনে তাদের উপস্থিতি সীমিত করেছে। জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক আদালত বারবার এই নীতিগুলোর সমালোচনা করেছে।
নারীর মুক্তি বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; নারীদের নিজেদের সংগ্রামই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকা শক্তি।
একজন সংসদ সদস্যের এই প্রতিবাদ আজ শুধু একটি পোশাকবিধির বিরুদ্ধে নয়, নারীর ওপর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাদের সংগ্রাম মূলত মানুষের মতো বাঁচার সংগ্রাম। এবং নারীদেরই এসব ধর্মীয় মৌলবাদ, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দাঁড়াতে হবে।
