নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা একটি মৌলিক প্রশ্ন। এমন প্রশ্নের বিপরীতে রাষ্ট্র, ধর্ম, সমাজ ও পরিবার প্রশ্নের আঙুল তুলেছে। ভুলুণ্ঠিত হয়েছে নারীর অগ্রযাত্রা। মৌলিক প্রশ্নের বিপরীতে যখন প্রশ্ন উত্থাপনের চেষ্টা করা যায়, এটি মানবাধিকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নারীবিদ্বেষ, বৈষম্য এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীদেরই সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠ হয়ে উঠতে হবে।
যৌনাচারী নবী মোহাম্মদের ইসলাম নারীর সেই স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ধর্মের ইসলামের নামে নারীর জন্য পর্দা করাকে মৌলিক বিধান/ফরজ ইবাদত হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। নারীদের এমনভাবে সংকীর্ণ করে ফেলা হয়েছে, যেখানে একজন নারীর পরিচয়-চিহ্নকে ঢেকে ফেলা হয়েছে। এটি স্পষ্টতই নারীবিদ্বেষ ও নারী সমাজের প্রতি অবমাননা।
উল্লেখ্য, বিএনপির কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী সম্প্রতি সংসদে মৌলবাদী জামায়াতের সংরক্ষিত আসনে মনোনীত নারী সংসদ সদস্যদের পর্দা করা নিয়ে সেসব নারীদের পক্ষে আওয়াজ তোলেন। যারা ধর্মীয় বিধানের যাঁতাকলে পিষ্ট এবং রাষ্ট্র ও সমাজের মানুষের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার থাকলেও, নিজেদের ঘরেই এরা অধিকারবঞ্চিত।
জামায়াতের বোরকা ও নিকাব পরিহিত নারী সংসদ সদস্যদের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “দুজনের বক্তৃতা শুনেছি, আগামীতে কিছু করতে পারবে, ভবিষ্যৎ আছে, লেখাপড়া জানা। কিন্তু বুঝলাম না তো, কারা আপনারা? আপনারা এদিকে (নিজেদের দিকে) দেখতে পারেন, আমরা এই দিকে দেখলে কী আছে বুঝব না, সেটা তো ঠিক না।”
যেকোনো পোশাক—হিজাব, নিকাব, বোরকা বা অন্য কিছু—যদি স্বেচ্ছায় পরা হয়, সেটি এক বিষয়। কিন্তু যদি রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজ বা ধর্মীয় পুলিশ জোর করে চাপিয়ে দেয়, তবে সেটি আর ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; সেটি স্বাধীনতার প্রশ্ন। মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামী যে সংসদে উপস্থিত সেসব নারী সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতাকে খর্ব করে ধর্মের বোরকা ও নিকাব পড়িয়েছে, এটি মৌলিক অধিকারের ব্যত্যয়।
এটি শুধুমাত্র পোশাকের বিতর্ক নয়। এটি নাগরিক পরিচয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় বৃত্তের বেড়াজালে নারীর সামাজিক অবস্থানের এক গভীর সংকটের চিত্র। এমন চিত্র সহজেই উপলব্ধি করা যায়।
আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদে মুখের ছবিই থাকে প্রধান ভিত্তি। কারণ, মুখমণ্ডলই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়চিহ্ন। যখন কেউ সেই মুখ সম্পূর্ণ ঢেকে রাখেন, তখন তার নাগরিক পরিচয়টি কার্যত অদৃশ্য হয়ে যায়।
বোরকা ও নিকাবের আড়ালে আসলে কে আছেন, তা বাইরে থেকে অন্য কারও পক্ষে নিশ্চিতভাবে জানা অসম্ভব। এই বাস্তবতার কারণেই আজ বিশ্বের বহু আধুনিক দেশ নিরাপত্তার স্বার্থে জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সংসদ, আদালত, বিমানবন্দর বা অন্য যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে কোনো অস্পষ্টতার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
সংসদের স্পিকার হয়তো যে কোনও পোশাক পরার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা বলেছেন, তবে মনে রাখতে হবে—গণতন্ত্রে কোনো স্বাধীনতাই সীমাহীন নয়। যেখানে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত, সেখানে আইনি সীমারেখা তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সংসদ সদস্যরা কেবল নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করেন না, তাঁরা একেকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁদের জনগণের সামনে দৃশ্যমান ও জবাবদিহিমূলক থাকতে হয়। সংসদের মতো একটি সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে প্রত্যেক সদস্যের পরিচয় স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হওয়াটাই সংসদীয় রীতির প্রধান শর্ত।
তবে এই বিষয়ের আপত্তি কেবল নিরাপত্তার খাতিরেই নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর নৈতিক কারণ। আমরা এমন একটি প্রগতিশীল সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে নারীরা কোনো দ্বিধা বা ভয় ছাড়া, সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের মুখ, নিজের পরিচয় এবং নিজের স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা নিয়ে প্রকাশ্যে মেরুদণ্ড সোজা করে চলবেন। নারীকে সর্বদা আড়ালে বা পর্দার পেছনে রাখার যে সংস্কৃতি, তা নারীর স্বাধীনতা, সমঅধিকার এবং ক্ষমতায়নের আধুনিক ধারণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
যে ইসলাম, যে ধর্ম, যে সমাজ নারীর মুখমণ্ডলকে বিপজ্জনক, প্রলোভনসৃষ্টিকারী কিংবা লজ্জার বিষয় বলে মনে করে, সেই সমাজ আসলে নারীর প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন করতে পারে না। নারীর মর্যাদা তার সমাজ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় বা লুকিয়ে থাকায় নয়; বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে সমাজে দৃশ্যমান থেকে, স্বাধীনভাবে এবং সমান অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে।
