রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও যৌন পরিচয়ের মানুষের ভয়হীন ও শান্তিপূর্ণভাবে একত্রিত হওয়া, নিজের মত মানুষের সাথে বন্ধন গড়া এবং সম্মিলিত অস্তিত্বকে মর্যাদার সঙ্গে প্রকাশ করার অধিকার আছে। রাষ্ট্র সার্বজনীন। রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকতে পারে না।
বাংলাদেশে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম ধর্মকে কেন্দ্র করে মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থার পদচারণা দশকের পর দশক ধরে। খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন থেকে শরিয়াহ আইনের বাস্তবায়ন, এর প্রতিটি পরতে শোষণ, বঞ্চনা ও নিগ্রহের ইতিহাস। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মান্ধতা এবং মৌলবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা আক্রান্ত এ দেশের নাগরিক পরিচয়ে এ দেশেরই আলো-বাতাস ও পরিবেশে বেড়ে ওঠা ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও ভিন্ন যৌন পরিচয়ের এলজিবিটিকিউর সংখ্যালঘু মানুষেরা। যেখানে রাষ্ট্রের নাগরিক পরিচয় তাদের মর্যাদাপূর্ণ এবং ব্যক্তি নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত করতে পারে না।
ভিন্নতা থাকা সংখ্যালঘু পরিচয়ে অবস্থান করা এসব মানুষের উপর নিপীড়ন, হেনস্তা, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘনাপ্রবাহ চলতে থাকে শুধুমাত্র ধর্ম ইসলাম, মৌলবাদ ও ধর্মীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উৎপীড়নের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইন থেকে সংবিধান—এর কোনোকিছুই মানুষের সমধিকারকে প্রতিষ্ঠিত না করে ভূলুণ্ঠিত করেছে। ইসলাম ধর্মের নামে, কোরআনের আইন, শরিয়াহ, ইজমা, কিয়াস, হাদিসের ভুলব্যাখ্যা, অপব্যাখ্যা থেকে এমন কোনো হীনমন্যতা নেই, যা ধর্মবিশ্বাসী এসকল মানুষ ও গোষ্ঠীর সদস্যদের চরমপন্থী মনোভাবের মধ্য দিয়ে সেসব মানুষের জীবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করেছে ইসলামের জাহেলিয়াত যুগের মতো।
বাংলাদেশের সংবিধানে প্রস্তাবনার শুরুতে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” যুক্ত আছে ১৯৭৭ সাল থেকেই ঐতিহাসিকভাবে। এবং ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর পরও এটি বহাল রাখা হয়। অন্যদিকে, অনুচ্ছেদ ২ক-তে বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম।” কিন্তু এ রাষ্ট্র এলজিবিটিকিউ মানুষদের লিঙ্গ বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি না দিলেও একটি সুনির্দিষ্ট ধর্ম ইসলামের স্বীকৃতি ঠিকই দিয়েছে ধর্মান্ধ মৌলবাদী মুসলিম গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রাখতে। এর মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের সংবিধান ধর্মের আগ্রাসন, মৌলবাদ, চরমপন্থাকে রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্থায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভিন্নতা থাকা মানুষদের জীবন, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারকে হত্যাযজ্ঞ করেছে এসকল ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাছে। জিম্মি করা হয়েছে এসকল মানুষদের।
বাংলাদেশের সংবিধান একটি আত্মস্বীকৃত মৌলবাদের দলিলে পরিণত হয়েছে। যেখানে মানুষের জন্য আইন নয়, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, লিপিবদ্ধ হয়েছে এ বাংলাদেশকে সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত করার মদিনা সনদ। এ সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে এর দ্রুত পুনর্লিখন ও সংস্কার জরুরি।
সংবিধানে থাকা সকল ধর্মভিত্তিক উপকরণকে ছুড়ে ফেলতে হবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে কোনো ধর্ম থাকতে পারে না। ধর্ম ইসলাম, মৌলবাদীদের বাংলাদেশের সংবিধান ও ইসলামী মৌলবাদীদের স্বার্থ রক্ষার এ দলিল মুছে ফেলতে হবে।
