বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসন এবং সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে মুক্তচিন্তার মানুষের সরলরৈখিক চিত্র। এমন চিত্রের বিপরীতে কেউ কেউ নিজেদের ধর্ম, ধ্যানধারণা ও পরলৌকিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে জড়ানোর ঘটনাপ্রবাহও চলে আসছে একটি দীর্ঘ যুগ ধরে।
ধর্মবিশ্বাস একান্তই ব্যক্তিগত ও আত্মিক। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্ম ইসলামকে কেন্দ্র করে মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থাকে রাজনীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার এক ধরনের প্রয়াস। জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিসসহ ইসলামী ঐক্যজোটের মধ্য দিয়ে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার উচ্ছ্বাস দেখেছে এ দেশের মানুষ। সারাদেশে মৌলবাদীদের আকস্মিক এ উত্থানের পেছনের উদ্দেশ্য কী?
ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সাধারণ মুসলমান থেকে মৌলবাদী মুসলমান এবং ধর্মান্ধ মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বৃহৎ অংশে মিশে আছে বিদ্বেষ। নারী বিদ্বেষ, জাতি বিদ্বেষ, ভিন্নমত বিদ্বেষ, সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা, ভিন্ন যৌনতা এবং ভিন্ন মতাদর্শের মানুষদের দমন-পীড়নের ইতিবৃত্ত।
এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠীরা সরব হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আজ জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের অবস্থানে। এমন দৃশ্য বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য অনিশ্চয়তার। এরই সাথে সারাদেশে একযোগে সাদাকালো কালেমাখচিত পতাকার মিছিল, খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে উগ্রবাদীদের রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার চিত্র গত দেড় দশকের ব্যবধানে আতঙ্কিত করেছে এ দেশের সাধারণ মানুষদের।
জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক দল হঠাৎ করে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার পরপরই স্লোগান উঠেছে, জয় জয় পাকিস্তান; দেশ বানাবো আফগানিস্তান। কিন্তু শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষ কট্টরপন্থী তালেবানি শাসনব্যবস্থা, সৌদির রাজতন্ত্র, ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র চায়? না, চায় না। প্রত্যাশাও করে না।
বাংলাদেশের মানুষ ধারণ করে ১৯৭১ সালের সেই চেতনাকে; যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ। সেখানে মৌলবাদ, উগ্রবাদ, চরমপন্থার ওপর ভিত্তি করে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি কোনোদিন প্রভাব বিস্তার করুক এবং ভিন্নমত, ধর্ম, বর্ণ ও যৌন পরিচয়ের মানুষেরা নিগ্রহের শিকার হোক—এটি প্রত্যাশা করে না কেউ। ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের মানুষ এসব উগ্রবাদী গোষ্ঠীদের বিষয়ে সোচ্চার।
মৌলবাদীদের আগ্রাসনে, ধর্ম, শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে এখানে কাউকে হত্যাযজ্ঞ করে তোলা হবে না, সকল মানুষ নিজেদের পূর্ণ অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করবে—এমন বাংলাদেশই আমরা সকলে প্রত্যাশা করি।
